আজ থেকে সিঙ্গাপুরে প্রবেশ করতে পারবেন বাংলাদেশিরা। তবে সবাই নন, শুধু প্রবাসী শ্রমিক, চিকিৎসাপ্রার্থী ও শিক্ষার্থীদের প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে। যদিও অনুমতির সঙ্গে একগাদা শর্তও জুড়ে দিয়েছে সিঙ্গাপুর সরকার।

ট্রাভেল এজেন্সিগুলো জানিয়েছে, সিঙ্গাপুরে প্রবেশের আগে প্রবাসীদের কিছু নিয়মকানুন মানতে হবে। পাশাপাশি দেশটিতে পা রেখেই তাদের গুনতে হবে মোটা অঙ্কের অর্থ।

সিঙ্গাপুর সিভিল অ্যাভিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ফ্লাইটের টিকিট কেনার পূর্বশর্ত হিসেবে প্রবাসী শ্রমিকদের এজেন্সি বা স্পন্সরের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের (এমওএম) কাছ থেকে অনুমতিপত্র নিতে হবে। অনুমতিপত্র পেলেই কেবল তারা টিকিট কিনে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে রওনা হতে পারবেন।

সিঙ্গাপুরে যাওয়ার পর তাদের করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রান্ত সতর্কতা হিসেবে ১৪ দিনের জন্য একটি হোটেলে আইসোলেশনে থাকতে হবে। হোটেলে থাকার জন্য আনুমানিক ২২০০ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার খরচ করতে হবে প্রবাসীদের। আইসোলেশনের জন্য বাংলাদেশ থেকে হোটেল বুকিং করেই কেবল সিঙ্গাপুরে প্রবেশ করতে পারবেন তারা।

প্রবাসীদের ভাষ্যে, ২২০০ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় এক লাখ ৩৬ হাজার টাকা আইসোলেশন খরচ তাদের জন্য বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’।

ফকিরাপুলের রাফিয়া ট্রাভেলস এজেন্সির সেলস অ্যান্ড টিকিটিং বিভাগের কর্মকর্তা মো. রাসেল বলেন, ‘আমাদের সিঙ্গাপুর থেকে ই-মেইলে কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী প্রবাসীদের ঢাকা থেকে টিকিটের সঙ্গে কোভিড-১৯ নেগেটিভ সার্টিফিকেট নিতে হবে।

সঙ্গে ২২০০ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার নিয়ে যেতে হবে। এটি তাদের ১৪ দিন হোটেলে আইসোলেশনে থাকার খরচ হিসেবে ব্যয় হবে। এ খরচ না নিয়ে গেলে কোনো প্রবাসী সিঙ্গাপুরে প্রবেশ করতে পারবে না বলে জানানো হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যাদের কাছে টিকিট বিক্রি করছি তাদের কাছে এই শর্তগুলো বারবার বলে দিচ্ছি, যেন সেখানে গিয়ে তারা আমাদের দোষারোপ করতে না পারেন।’

প্রবাসীদের অতিরিক্ত খরচের বিষয়ে সিঙ্গাপুরে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. তৌহেদুল ইসলাম  বলেন, ‘সিঙ্গাপুরে প্রবেশ করা প্রতিটি মানুষকেই কোয়ারেন্টাইন বা ইনস্টিটিউশনাল আইসোলেশনে থাকতে হয়। এমনকি একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের একজন মন্ত্রীকেও সিঙ্গাপুরে আইসোলেশনে থাকতে হয়েছে।

সবাইকেই থাকতে হবে। আইসোলেশনের জন্য সিঙ্গাপুর কিছু প্রতিষ্ঠান বা হোটেলকে দায়িত্ব দিয়েছে। থাকা-খাওয়ার খরচ হিসেবে ওই প্রতিষ্ঠানই ২২০০ ডলার খরচ নেবে, সিঙ্গাপুর সরকার বা বাংলাদেশ সরকারের এখানে কিছুই করার নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের কর্মীরা যেসব কোম্পানিতে চাকরি করেন, সেই কোম্পানিকে এ ব্যয় করতে হবে বলে জানি। তবে যেসব প্রবাসীর বর্তমানে চাকরি নেই, তাদের সম্পূর্ণ নিজ খরচেই আইসোলেশনে থাকতে হবে।’

এ বিষয়ে ২৫ অক্টোবরের সিঙ্গাপুরের টিকিট কেনা সরদার ইসমাঈল হোসেন নামে এক প্রবাসী বলেন, ‘আমি সিঙ্গাপুরের একটি সুপারশপে কাজ করি। চার মাস ধরে কাজ নেই। আমার পক্ষে ২২০০ ডলার দেয়া অসম্ভব ছিল। তাই আমি আমার মালিকের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বিমানবন্দরে আমার জন্য ২২০০ ডলার পরিশোধ করবেন। তিনি জানিয়েছেন, পরে প্রতি মাসে আমার বেতন থেকে এই ফি’র একটা অংশ কেটে নেয়া হবে।’

তিনি আরও জানান, এ অঙ্কের আইসোলেশন ফি’র কারণে সিঙ্গাপুর প্রবাসী অনেক বাংলাদেশিকে ভুগতে হবে।

খরচ এখানেই শেষ নয়। সিঙ্গাপুরগামীদের ঢাকা থেকে রওনা হওয়ার আগের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়ে ‘নেগেটিভ’ সার্টিফিকেট সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি সবাইকে সিঙ্গাপুর পৌঁছে আবারও নিজ খরচে কোভিড-১৯ টেস্ট করাতে হবে।

প্রবাসীদের বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যেতে আজ থেকে নিয়মিত প্যাসেঞ্জার ফ্লাইট চালু করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ফ্লাইট পরিচালনা ও নিয়মকানুনের বিষয়ে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও মোকাব্বির হোসেন জানান, সিঙ্গাপুর সরকারের অনুমতি পাওয়ায় ১ অক্টোবর থেকে প্রতি বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুরে শিডিউল ফ্লাইট পরিচালনা করবে বিমান। যাত্রীরা দেশটির স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিমানের মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট, ট্রাভেল এজেন্ট বা বিমানের সেলস কাউন্টার থেকে টিকিট কিনতে পারবেন।

এদিকে সিঙ্গাপুরের সিভিল অ্যাভিয়েশনের পাশাপাশি প্রবাসীদের খরচ বাড়িয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও। বিমানের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, সিঙ্গাপুর যেতে প্রবাসীদের ওয়ানওয়ে (ঢাকা-সিঙ্গাপুর) টিকিটের মূল্য দিতে হবে ৪১ হাজার ১৯২ টাকা।

টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে বিমানের চারটি ক্যাটাগরি থাকলেও সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রে শুধু ‘ইকোনমি ফ্লেক্সিবল’ অর্থাৎ সর্বোচ্চ দামের ক্যাটাগরিতে সব টিকিট বিক্রি করছে তারা। করোনার আগে স্বাভাবিক সময়ে সিঙ্গাপুরের ওয়ানওয়ে টিকিটের মূল্য ছিল ২০ হাজার টাকার মতো।

সিঙ্গাপুর সরকারের অতিরিক্ত খরচ এবং বিমানের অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন প্রবাসীরা। বগুড়ার মোহাম্মদ মাসুম আলম নামের এক প্রবাসী বলেন, ‘আমি মার্চের ১৯ তারিখ সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরি।

জুন মাসের ১৭ তারিখ ফিরতি ফ্লাইটের টিকিট কাটা। তবে লকডাউনের কারণে তিন মাস দেশে থাকতে বাধ্য হই। ইতোমধ্যে গ্রামের বাড়িতে অনেক ধারদেনা হয়েছে। এক মাস ধরে টিকিটের জন্য ঢাকায় যাতায়াত করতে হচ্ছে। সবমিলে আমাদের জীবন অনেকটা দুর্বিষহ। এরপর দেখলাম সিঙ্গাপুর সরকার ও বিমানের কারণে অতিরিক্ত দেড় লাখ টাকার মতো বেশি খরচ হচ্ছে। এই মুহূর্তে এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যেসব বাংলাদেশি সিঙ্গাপুরে কাজ করি তাদের অধিকাংশই শ্রমিক ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। নিশ্চয়ই আমাদের কোম্পানি ২২০০ ডলারের আইসোলেশন ফি পরিশোধ করবে না। এগুলো আমাদেরই পরিশোধ করতে হবে। অনেকে অতিরিক্ত খরচের জন্য সিঙ্গাপুর যেতে পারবে না।’

অপরদিকে শ্রমিক ছাড়া অন্যদের সিঙ্গাপুরে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছে দেশটির সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ। তারা জানায়, দেশটিতে আপাতত বাংলাদেশ থেকে কোনো পর্যটক বা দর্শনার্থী যেতে পারবেন না। তবে চিকিৎসাপ্রত্যাশীরা যেতে পারবেন। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশি এজেন্টের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মেডিকেল সার্টিফিকেট বা অনুমতিপত্র লাগবে।

সিঙ্গাপুরে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ফেরার আগে বাংলাদেশ থেকেই সিঙ্গাপুরের শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি নিতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুরে যাওয়া কারও জন্যই দেশটির চাঙ্গি বিমানবন্দরে কোনো দর্শনার্থী আসতে পারবেন না।

সিঙ্গাপুরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ছাড়াও ৩ অক্টোবর থেকে ফ্লাইট পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স।

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ পরিস্থিতির মধ্যে দেশে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে বিপর্যয় নেমেছে। চলতি বছর সাড়ে সাত লাখ মানুষকে বিদেশে চাকরির জন্য পাঠানোর কথা থাকলেও আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে মাত্র এক লাখ ৮১ হাজার ২৭৩ জনকে পাঠানো সম্ভব হয়েছে। সিঙ্গাপুরের মতো অন্যান্য দেশ যদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রবেশে এভাবে বিধিনিষেধ আরোপ করে তাহলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে গত ২১ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য, চীন, হংকং, থাইল্যান্ড ছাড়া সব দেশের সঙ্গে এবং অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রীবাহী ফ্লাইট চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। এরপর আরেকটি আদেশে চীন বাদে সব দেশের সঙ্গে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

এ নিষেধাজ্ঞা সরকারি সাধারণ ছুটির সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যায়ক্রমে ১৪ এপ্রিল, ৩০ এপ্রিল, ৭ মে, ১৬ মে, ৩০ মে এবং ১৫ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ১৬ জুন থেকে প্রথমবারের মতো ঢাকা থেকে লন্ডন এবং কাতার রুটে ফ্লাইট চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়। এরপর আরও কিছু রুটে ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১ অক্টোবর থেকে সিঙ্গাপুরের ফ্লাইট চালু হচ্ছে।