অতিথিশূন্য তারকা হোটেল, মহাসংকটে পর্যটন শিল্প

মহামারি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নেমেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম এভিয়েশন ও পর্যটন খাত। করোনার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিভিন্ন ধরনের সভা-সেমিনার স্থগিত হয়ে যাওয়ায় পর্যটনের প্রধান উপখাত হোটেল ব্যবসা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

বিশেষ করে অভিজাত ফাইভ স্টার বা পাঁচতারকা হোটেলগুলো বেশি সংকটে পড়েছে। কারণ এসব হোটেলের অতিথিদের সিংহভাগই বিদেশি। কিন্তু গত মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রুটের ফ্লাইট সংকুচিত হতে থাকায় পাঁচতারকা হোটেলগুলো অতিথিশূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে সাময়িক বিপর্যয় থেকে বের হতে পারছে না এ খাতের ব্যবসায়ীরা।

এদিকে করোনা মহামারিতে বিশ্বের পর্যটন খাতের ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের উপরে লোকসান হবে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাড।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ৩ লাখ মানুষ এবং পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল ৪০ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে ট্যুরিজম খাত। তার ওপর সরকার ঘোষিত প্রণোদনা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন পাঁচতারকা হোটেলে যোগাযোগ করে জানা গেছে, দেশে করোনা রোগী শনাক্তের পর থেকে ব্যাপকহারে অতিথির সংখ্যা কমতে শুরু করে। ফলে চার মাস ধরে অভিজাত এসব হোটেলে অতিথি নেই বললেই চলে। এর মধ্যে গত রমজানের আগ থেকে ঈদের পর প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী হোটেলগুলো বন্ধ ছিল।

বর্তমানে হোটেল খোলা হলেও গেস্ট নেই। এমনকি বিভিন্ন ধরনের ছাড়ের অফার দিয়েও অতিথি মিলছে না। কারণ দেশে বিদেশিদের আনাগোনা নেই বললেই চলে।

বিদেশি অতিথির পাশাপাশি পাঁচতারকা হোটেলগুলোর বাণিজ্যের একটি বড় উৎস বলরুমসহ বিভিন্ন সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন ধরনের সেমিনার ও সম্মেলন। এসব সম্মেলনের বড় অংশের আয়োজন করে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজিত হয় এসব হোটেলে।

এর পাশাপাশি জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থা, বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও বিভিন্ন ধরনের সিভিল সোসাইটি সংগঠনও নানা ধরনের সভা-সম্মেলন আয়োজন করে। কিন্তু করোনাকালে এগুলোর সবই স্থগিত। চার মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো ব্যাংক এজিএম আয়োজন করেনি।

বড় কোনো করপোরেট গ্রুপও এ ধরনের কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারেনি। এসব আয়োজন পাঁচতারকা হোটেলগুলোর রাজস্বের অন্যতম প্রধান খাত। এর পাশাপাশি বিদেশি অতিথি না থাকায় হোটেলগুলোর নিজস্ব রেস্তরাঁ ও বারগুলোর কার্যক্রমও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

এমনকি সুইমিংপুল ও ব্যায়ামাগারেও নেই কোনো সমাগম। একমাত্র হোম ডেলিভারি ব্যবসা সচল। সব মিলে তাদের ব্যবসা ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

হোটেলসংশ্লিষ্টরা জানান, ‘স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ব্যবসা প্রায় এক-তৃতীয়াংশে বা তারও কমে নেমে এসেছে। বিশেষ অফারেও গ্রাহক পাওয়া যাচ্ছে না। বিদেশি অতিথি ছাড়াও আগে মোটামুটি প্রায় সব হোটেলেই সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অফিসের সভা-সেমিনার থাকতো, যা এখন পুরোপুরি বন্ধ।

রাজধানীর অন্যতম প্রধান পাঁচতারকা প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে স্বাভাবিক সময়ে কাওরান বাজারের এ হোটেলটিতে সভা-সেমিনার আয়োজনের জন্য কয়েক মাস আগ থেকে বুকিং দিতে হয়। এমনকি অতিথিদের জন্য রুম বুকিং পেতেও বেশ আগে থেকেই বুকিং দেয়া লাগে। কিন্তু করোনা সংক্রমণের পর সে চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে।

হোটেলের এক কর্মকর্তা জানান, ‘বর্তমানে ব্যবসার অবস্থা এতটাই নাজুক যে, গত তিন মাসে আমাদের বিদেশি অতিথি এসেছেন হাতেগোনা কয়েকজন। এর বাইরে চীনের একটি প্রতিনিধিদল কিছুদিন ছিল। তাছাড়া আর কোনো অতিথি আসেনি। হোটেল খোলা, কিন্তু অতিথি নেই এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন কখনো হইনি। প্রতিনিয়ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।

হোটেল সোনারগাঁও সূত্রে জানা গেছে, ‘প্রায় চার মাস ধরে বিদেশি অতিথি নেই বললেই চলে। আপাতত কিছু ফুড ডেলিভারি সেবা চালু আছে। সেগুলোও চলছে সীমিত পরিসরে।

একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে, বিমান বন্দরের কাছে থাকা হোটেল লা মেরিডিয়ানে। হোটেলটি অল্প সময়ে খুব বেশি পরিচিতি পেয়েছে। এটি প্রায় বেশির ভাগ সময় মুখরিত থাকে বিদেশি অতিথিদের পদভারে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকে আর সে অবস্থা নেই।

লা মেরিডিয়ান কর্তৃপক্ষ জানান, সাধারণ ছুটির সময় অনেক দিন হোটেল বন্ধ রাখা হয়েছিল। বর্তমানে সাধারণ ছুটি নেই। ফলে হোটেল চালু করা হয়েছে, কিন্তু অতিথি বা ক্রেতা নেই। করোনার আগের সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করলে বলতে হবে ব্যবসার চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। কেবল বাংলাদেশেই যে এমন অবস্থা চলছে তা নয়, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের চিত্রই এখন এমন।

এদিকে ব্যবসায় ধস নামায় টিকে থাকার তাগিদে কিছু তারকা হোটেল অনলাইন ও মুঠোফোনের মাধ্যমে গ্রাহকদের নানা ধরনের ছাড়ের অফার দিচ্ছে। কিন্তু সে উদ্যোগেও তেমন সাড়া মিলছে না যেমন; হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল রুমপ্রতি ১১ হাজার টাকা ভাড়ার প্রস্তাব করে নিয়মিত গ্রাহকদের মুঠোফোনে বার্তা পাঠাচ্ছে। দুই রাত অবস্থান করলে ১ রাত বিনামূল্যে অবস্থানের অফারও দিচ্ছে অভিজাত হোটেলটি।

একই রকম স্পেশাল অফার দিচ্ছে আরেক অভিজাত হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও। ৯ হাজার ৯৯৯ টাকায় দুই বেলার খাবারসহ ২৪ ঘণ্টার জন্য রুম ভাড়ার প্রস্তাব দিয়ে নিয়মিত গ্রাহকদের মুঠোফোনে বার্তা পাঠাচ্ছে হোটেলটি। যদিও স্বাভাবিক সময়ে রুম ভাড়া ও খাবারের জন্য ২০ হাজার টাকার বেশি গুনতে হতো গ্রাহকদের।

শুধু এই হোটেলগুলোই নয়, রাজধানীর আরেক অভিজাত হোটেল রেডিসন ব্লু’র চিত্রও একই। এ ছাড়া অভিজাত আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশান ও বনানীতে বেশ কয়েকটি পাঁচতারকা, চারতারকা ও তিনতারকা মানের হোটেল রয়েছে। তাদের ব্যবসায়ও ধস নেমেছে। এসব হোটেলের মধ্যে রয়েছে লেকশোর, হোটেল আমারি, সিক্স সিজনস, সারিনা প্রভৃতি।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের নির্বাহী কর্মকর্তা জাভেদ আহমেদ বলেন, আমাদের পর্যটন খাত সম্পর্কে সেরকম ধারণা অনেকের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। এই খাতটা ক্রমে ক্রমে অনেক বড় হচ্ছে। প্রায় দেড় কোটি ডমেস্টিক ট্যুরিস্ট আমাদের রয়েছে। কিন্তু করোনাকালে এপ্রিল পর্যন্ত আমরা হিসাব করেছিলাম পাঁচ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আমরা ক্ষতির মধ্যে পড়েছি। জাভেদ আহমেদ বলেন, এই সেক্টরটা ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।

এই সেক্টরে অনেক বিনিয়োগ আছে, অনেক লোক কাজ করে। আমরা প্রথম থেকেই বলে আসছি, সরকার ঘোষিত যে প্রণোদনা, সেটা পাওয়ার যোগ্যতা রাখে ট্যুরিজম খাত। কিন্তু প্রণোদনা পেতে দেরি হচ্ছে।

এদিকে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের সমপ্রতি প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, এ খাত ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ে গেছে। মহামারির কারণে পর্যটন ব্যবস্থা যতদিন ব্যাহত হবে, ক্ষতি ততো বাড়তে থাকবে বলে জানায় সংস্থাটি।

যদি লকডাউনের গেল ৪ মাসই হিসাব করা হয়, তাহলে মহামারিতে বিশ্বের পর্যটন খাতের এরইমধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের উপরে লোকসান হয়ে গেছে। যা বিশ্বের মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধির দেড় শতাংশ। যদি লকডাউন বা ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা ৪ মাসের পরও বহাল থাকে, তাহলে এই লোকসান পৌঁছাতে পারে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের উপরে। মহামারিতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণে বিধিনিষেধ ১২ মাস বহাল থাকলে ক্ষতি হয়ে যেতে পারে ৩.৩ ট্রিলিয়ন ডলার।

প্যাসিফিক ট্র্যাভেল এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’র মহাসচিব তৌফিক রহমান বলেন, প্যানডেমিকের কারণে ট্যুরিজম একেবারে চলছেই না। যে সময়টাতে বন্ধ হয়েছে সে সময়টা ছিল একেবারে পিক সিজন। সব ক্ষেত্রেই আমাদের কার্যক্রম একেবারে থমকে গেছে।

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প একেবারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে অনিশ্চয়তার জায়গা হলো, সামনে তো আমরা কোনো আলো দেখতে পারছি না। এদিকে বাংলাদেশ সরকার যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে সেটা এখন পর্যন্ত কাগজে কলমেই আছে।

আমাদের কেউ কোনো টাকা এখন পর্যন্ত পায়নি। আমাদের বলা হয়েছে ব্যাংক এবং ক্লায়েন্টের রিলেশনের ওপর নির্ভর করবে এই প্রণোদনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *